ওয়েব ডেস্ক, আলিপুরদুয়ার : মানব সমাজে বাবার চোখে জল আসে যখন মেয়ে বিদায়ের সময়, আর জামাই বিদায় নিলে শ্বশুরবাড়ির লোকেদের মনে মনে খানিক স্বস্তি হয়। কিন্তু আলিপুরদুয়ার ১ নম্বর ব্লকের পশ্চিম শিমলাবাড়ির গল্পটা একটু আলাদা। সোমবার যখন সার সার গাড়ির কনভয় গ্রাম ছাড়ছিল, তখন কারও মনে শোকের ছায়া, আবার কেউ বা বুক ঢিপঢিপানি থেকে মুক্তি পেয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। কারণ এই জামাই কোনও সাধারণ মানুষ নন, রীতিমতো একশৃঙ্গ গন্ডার! গত পাঁচ বছর ধরে যে চিলাপাতা জঙ্গলের মায়া কাটিয়ে শিমলাবাড়ির ঘরে ঘরে ‘ঘরজামাই’ হয়ে জাঁকিয়ে বসেছিল। সোমবার সেই রাজকীয় জামাইয়ের বিদায়বেলায় গোটা গ্রাম ভেঙে পড়েছিল রাস্তায়।
প্রসঙ্গত, চিলাপাতা জঙ্গল সংলগ্ন এই গ্রামগুলিতে গন্ডারটির অবাধ যাতায়াত ছিল দীর্ঘদিনের। বন্যপ্রাণ হলেও গ্রামের মানুষ তাকে আপন করে নিয়েছিল। এলাকার লোক তাকে ডাকতেন ‘বুড়ো গন্ডার’ নামে, তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় নাম ছিল ‘ঘরজামাই’। গ্রামের আলপথ দিয়ে তার হেলতেদুলতে চলাফেরা ছিল নিত্যদিনের পরিচিত দৃশ্য। ঠিক যেন শ্বশুরবাড়িতে আবদার নিয়ে থাকা কোনও জামাই। তবে জামাইয়ের মেজাজ বলে কথা! মাঝেমধ্যে একটু-আধটু দুষ্টুমি যে করত না, তা নয়। কয়েকবার ফসলের ক্ষতি হয়েছে, এমনকি তার গুঁতোয় জখম হয়েছেন কয়েকজন। কিন্তু শিমলাবাড়ির মানুষ বিষয়টিকে ‘জামাইয়ের খুনশুটি’ হিসেবেই মেনে নিয়েছিলেন। বন্যপ্রাণ আর মানুষের এই সহাবস্থান উত্তরবঙ্গের বনাঞ্চল সংলগ্ন গ্রামগুলোতে এক বিরল উদাহরণ তৈরি করেছিল।
বন দপ্তর সূত্রের খবর, চিলাপাতা জঙ্গলের দত্তের বান এলাকায় এই একটি গন্ডারই দীর্ঘদিন ধরে ঘাঁটি গেড়েছিল। তাকে জঙ্গলে আটকে রাখতে ফেন্সিং দেওয়া হয়েছিল, কড়া নজরদারি চালিয়েছিলেন বনকর্মীরা। কিন্তু গ্রামের টানে সে বারবার ফেন্সিং ভেঙে লোকালয়ে ঢুকে পড়ত। শেষমেশ তার নিজের নিরাপত্তার স্বার্থেই তাকে জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এদিন সকালে ঘুমপাড়ানি গুলি ছুড়ে তাকে কাবু করা হয়। এরপর বিশাল ক্রেন ও লরির সাহায্যে কড়া নিরাপত্তায় তাকে জলদাপাড়ার উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। এই অভিযানে উপস্থিত ছিলেন বন দপ্তরের চিকিৎসক ও দমকলকর্মীরাও।
জামাই বিদায় নিতেই পশ্চিম শিমলাবাড়ির বাসিন্দারা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তাদের কথায়, বাড়িতে অনেকদিন কেউ থাকলে যেমন মায়া পড়ে যায়, তেমনই তাদেরও ওই গন্ডারের ওপর মায়া পড়ে গিয়েছিল। দিন কয়েক তাকে না দেখলেই পাড়ায় আলোচনা হত, কই জামাই কি চলে গেল নাকি! সেই আলোচনাগুলো আর হবে না। এই ভেবেই গ্রামবাসীদের অনেকের চোখে জল।
আরও পড়ুন : গ্রেপ্তার রায়গঞ্জের ত্রাস মহাদেব, বাকিদের খোঁজে চলছে তল্লাশি
জলদাপাড়ার এক বনকর্তা জানিয়েছেন, এদিন গন্ডারটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। সে সুস্থ রয়েছে। তাকে নিরাপদ স্থানে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। শিমলাবাড়ির ‘ঘরজামাই’ এখন জলদাপাড়ার নতুন সংসারে। পেছনে ফেলে গেল পাঁচ বছরের এক অদ্ভুত বন্ধুত্বের স্মৃতি আর একরাশ দীর্ঘশ্বাস।
